হূমায়ন ফরিদী: ছবি সংগৃহীত
আজ প্রখ্যাত অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীর জন্মদিন। ১৯৫২ সালের ২৯ মে আজকের এই দিনে পুরান ঢাকার নারিন্দায় জন্মগ্রহণ করেন। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র- তিন মাধ্যমেই ছিল তার সমান পদচারণা। তিন দশকের বর্ণিল ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন অনেক জনপ্রিয় নাটক ও চলচ্চিত্র।
অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদী এমনই একজন কিংবদন্তী; নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চ- সবখানেই ছিল তার অবাধ বিচরণ। শুধু অভিনয় দিয়েই মানুষকে বিমোহিত করেছিলেন ডাকসাইটে এই অভিনেতা। তাকে বলা হয় অভিনেতাদের অভিনেতা, একজন আদর্শ শিল্পী। তার অভিব্যক্তি, অট্টহাসি, ব্যক্তিত্বের ভক্ত ছিলেন না এমন লোক পাওয়া দুষ্কর! অনেকের কাছে তার ব্যক্তিজীবনের গল্পও বেশ অনুপ্রেরণার।
একজন প্রকৃত অভিনেতা মনে হয় তিনিই যিনি মঞ্চ, নাটক, সিনেমা—সব জায়গাতেই দক্ষতার সঙ্গে অভিনয় করতে পারেন; আর মানুষের মন জয় করতে পারেন। কানকাটা রমজান থেকে নব্বই দশকের একের পর এক ব্যবসাসফল বাণিজ্যিক সিনেমা—সব জায়গাতেই ফরীদি সফল। দহন, একাত্তরের যীশুর মতো ভিন্ন ধরনের সিনেমাতেও তিনি নিজের প্রতিভার সাক্ষর রেখেছেন। ছোটপর্দাতেও তিনি সমান জনপ্রিয়। নব্বই দশকে এমন অবস্থা ছিল যে, দর্শক নায়ক নায়িকা না দেখে, শুধু তাকে দেখার জন্যই হলে আসতো। পরিচালক শহিদুল ইসলাম খোকন সম্ভবত এই কারণেই নিজের পরিচালিত ২৮ টি সিনেমার মাঝে ২৫ টিতেই ফরীদিকে রেখেছেন।
নিজে কখনোই হিরো হতে চাননি, একবার এই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন; ‘হিরো হওয়া তো সমস্যার! হিরোর কিছু নির্দিষ্ট কাজকর্ম করতে হয়, আমি সবসময়ই অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষ ভালোবেসে মনে হয় আমার মতো মানুষকে হিরো বানিয়ে দিয়েছে। যেখানেই যাই, অসংখ্য লোক চলে আসে। প্রিয় জায়গায় যেতে পারিনা, কিছুটা বিরক্ত লাগে। তবে এই ভালোবাসা ভালো লাগে অনেক, একদিন সকালে উঠে যদি আমি দেখি মানুষ আমাকে চিনতে পারছে না, তাহলে এর চেয়ে বড় দুঃখ আমি আর কোন কিছুতে পাব না। আমি চাই যে মানুষ আমাকে চিনবে।‘
আশি ও নব্বইয়ের দশকে যে ক’জন অভিনয়শিল্পী মঞ্চ ও টিভি নাটককে জনপ্রিয় করেছিলেন, হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন তাদের শীর্ষস্থানীয়। জীবদ্দশায় তিন দশকেরও বেশি সময় চলচ্চিত্রেও সমান দাপটের সঙ্গে অভিনয়ের মাধ্যমে রং ছড়িয়ে গেছেন নন্দিত ও বরেণ্য এই অভিনেতা। এর সুবাদে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্তের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নেন তিনি। নায়ক কিংবা খলনায়ক সব চরিত্রেই সমান পারদর্শিতা দেখানো এই গুণী শিল্পী কাটিয়েছেন অভিনয়ের বর্ণাঢ্য জীবন। তিনি এখনও আছেন সবার হৃদয়ে। ভক্তদের ভালোবাসায় হুমায়ুন ফরীদি একজন অমর অভিনেতা।
নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা মঞ্চ- সবখানেই ছিল হুমায়ুন ফরীদির অবাধ বিচরণ। ঢাকা থিয়েটারের ‘শকুন্তলা’, ‘মুনতাসীর ফ্যান্টাসি’, ‘কীর্তনখোলা’, ‘কেরামত মঙ্গল’-এর মতো মঞ্চনাটকে অভিনয় করে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। আদায় করে নেন দর্শকের ভালোবাসা।
হুমায়ুন ফরীদি চাঁদপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করেন ১৯৭০ সালে। এরপর একই বছর স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈব রসায়ন বিভাগে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় খাতা-কলম রেখে কাঁধে তুলে নেন রাইফেল। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে দামাল ছেলের মতো লড়াই করেছেন তিনি। অর্থনীতির খটমটে তত্ত্ব বাদ দিয়ে সেলিম আল দীনের কাছে নাট্যতত্ত্বে দীক্ষা নেন তিনি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় সদস্যপদ পান ঢাকা থিয়েটারের। এই নাট্যদল থেকেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে তার অভিনয়ের রঙগুলো। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে অনার্স সম্পন্ন করেন।
মঞ্চের গণ্ডি পেরিয়ে টিভি নাটক আর চলচ্চিত্রেও স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে নেন হুমায়ুন ফরীদি। ১৯৮০ সালে ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এর মাধ্যমে টেলিভিশন নাটকে অভিষেক হয় হুমায়ুন ফরীদির। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘নীল নকশার সন্ধ্যায়’ ও ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ নাটকে অভিনয় করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন। তার অভিনীত ধারবাহিক নাটক ‘সংশপ্তক’ আজও দর্শকের স্মৃতির পাতায় ভাস্বর। এতে কানকাটা রমজান চরিত্রে অভিনয় করে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান তিনি।
ফরীদির নাট্যাভিনয় থেকে চলচ্চিত্রে আসা ছিল অনেক নাটকীয়। দেশীয় চলচ্চিত্রের তখনকার বেহাল অবস্থা দেখে রূপালি পর্দার জন্য কাজ করবেন কিনা এ বিষয়ে দ্বিধায় ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত সুবর্ণা মুস্তাফার অকুণ্ঠ সমর্থনে ও নিজের দৃঢ়তায় এক নতুন আঙ্গিক নিয়ে বড় পর্দায় আসেন ফরীদি। তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’ তার অভিনীত প্রথম ছবি।
আজও এ প্রজন্মের কাছে তিনি সমান তালে জনপ্রিয়। গুণী এই অভিনেতার চলে যাওয়ার এতদিনেও বিন্দু মাত্র কমেনি জনপ্রিয়তা।
আজও তাকে নিয়ে আলোচনা হয়। আড্ডা জমে ওঠে চায়ের দোকানে। আহা কি অভিনেতাই না ছিলেন আমাদের হূমায়ুন ফরিদী।
এইদিনে তাকে স্মরণ করে নির্মাতা সাজ্জাদ খান ফেসবুক হ্যান্ডেলে লিখেছেন, অভিনয় দিয়ে সমস্ত মানুষের মন জয় করা চাট্টিখানি কথা নয়! কিন্তু সে কাজটি অবলীলায় করে দেখিয়েছেন হুমায়ুন ফরিদি। খলচরিত্রে অভিনয় করেও মানুষের মন জয় করতে পেরেছেন এমন অভিনেতা বাংলাদেশে হাতেগোনা যে কয়েকজন আছেন তাদের মধ্যে হুমায়ুন ফরিদি অন্যতম...একজন অসাধারণ মানুষের হয়েও খুব সাধারণ জীবনযাপন...জীবন সম্পর্কে পরিষ্কার বোধ তাকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে গিয়েছিল....নির্দ্বিধায় সবার সাথে মিশতে পারার গুণ সবার থাকেনা! হুমায়ুন ফরিদির সেই গুণ ছিল...এসব কারণে অভিনেতা হিসেবে তো বটেই মানুষ হিসেবেও হুমায়ুন ফরিদি ছিলেন সবার শ্রদ্ধার পাত্র... বলা যায় একজন আইকন....
আজ কিংবদন্তী অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদির জন্মদিন।
শুভ জন্মদিন
২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফাগুনের রঙে বিষাদ ছড়িয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন তিনি। রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন এই অভিনেতা। মারা যাওয়ার এতদিন পরেও ভক্তদের মনে এখনো জীবিত আছেন তিনি। তার কথা এখনো নাড়া দেয় ভক্তদের মন।
২০০৪ সালে ‘মাতৃত্ব’ ছবির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। বেঁচে থাকতে একুশে পদক পাননি এই শক্তিমান অভিনেতা। তবে মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন তিনি।
































