ছবি সংগৃহীত
ঢাকার গণপরিবহনে নারীদের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিশেষ ‘মহিলা পিংক বাস সার্ভিস’ চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। গোলাপি রঙের এসব বাসের চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী হিসেবে থাকছেন নারীরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ সার্ভিসের উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
বিআরটিসি জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন রুটে ১০টি বাস দিয়ে এ সেবা শুরু হয়েছে। ঢাকার বাইরে বগুড়ায় দুটি এবং চট্টগ্রামে দুটি বাসসহ মোট চারটি বাসও পিংক বাস সার্ভিসের আওতায় চলবে।
মোট ১৩৪টি স্টপেজে এ বাস সার্ভিস পরিচালিত হবে। এতে পিওএস মেশিনের মাধ্যমে ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। একটি বাসে পরীক্ষামূলকভাবে স্টারলিংকের ওয়াই-ফাই এবং তিনটি বাসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বাসেও এসব সুবিধা যুক্ত করা হবে।
বাড়ানো হবে বাস ও রুট
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, নারী যাত্রীদের চাহিদা বিবেচনায় ভবিষ্যতে পিংক বাসের সংখ্যা ও রুট বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে সেবার মানও উন্নত করা হবে।
তিনি বলেন, শুধু বাসের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, নারী যাত্রীরা যাতে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও যাত্রীবান্ধব পরিবেশ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। উদ্বোধনের সময় যে মানের সেবা দেওয়া হচ্ছে, দুই মাস পর সেটি আরও উন্নত করার জন্য বিআরটিসি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজ করতে হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকার গণপরিবহনের বিদ্যমান রুট ব্যবস্থাপনাও নতুন করে সাজানো প্রয়োজন। অনেক রুটের অস্তিত্ব না থাকলেও সেসব রুটের পারমিট রয়েছে। আবার কোথাও পারমিট না থাকলেও বাস চলাচল করছে। যাত্রীচাপ ও প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে রুট পারমিট ও রুট রেশনালাইজ করে নতুনভাবে চিহ্নিত করা হবে।
কেনা হবে ২০০ ইলেকট্রিক বাস
পরিবহন খাত আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সরকার সরাসরি ২০০টি ইলেকট্রিক বাস কেনার উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান শেখ রবিউল আলম। এসব বাসের মধ্যেও নারীদের জন্য বাস রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর পরিবহন থেকে বেরিয়ে এসে ঢাকায় পরিবেশবান্ধব ও মাল্টিমোডাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
আগের অনেক উদ্যোগ উদ্বোধনের পর কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধ হয়ে গেলেও পিংক বাসের ক্ষেত্রে এমনটি হতে দেওয়া হবে না বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। এ সেবাকে টেকসই, সমৃদ্ধ ও আরও বিস্তৃত করার চ্যালেঞ্জ সরকার ও মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেছে বলে জানান তিনি।
নারী কর্মসংস্থানেও ভূমিকা রাখবে
অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেন, নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াতের পাশাপাশি নারী চালক ও কন্ডাক্টরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ উদ্যোগ নারী কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি জানান, বিআরটিসির পিংক বাস সার্ভিসের জন্য ১০০টি ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ইভি) কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বিআরটিসির বহরে নতুন বাস সংযোজনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, ভবিষ্যতে বিআরটিসির বহরে নতুন বাস যুক্ত হলে নারীদের জন্য আরও বাস সংযোজন করা হবে। পিংক বাস সার্ভিস পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ইভি বাস চালুর জন্য প্রয়োজনীয় চালক ও কন্ডাক্টর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, পিংক বাসের নারী চালকদের আগে হালকা যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল। তাদের গাজীপুরে আবাসিক প্রশিক্ষণ দিয়ে বাস চালানোর জন্য মানসিক ও কারিগরি দক্ষতা তৈরি করা হয়েছে। এতে ভারী বাস চালানোর ক্ষেত্রে নারীদের ভয় ও মানসিক বাধা অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।
নারী চালক ও যাত্রীর অভিজ্ঞতা
নারী চালক খাদিজা আক্তার বলেন, সড়ক পরিবহনের মতো বড় খাতে নারী চালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। বিআরটিসির গাজীপুর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এক মাস ১৪ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি এ দায়িত্ব পেয়েছেন।
নারী যাত্রী ফাতেমাতুজ্জোহরা রুপা বলেন, পিংক বাস সার্ভিস নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করবে। চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারী সবাই নারী হওয়ায় হয়রানির আশঙ্কা কমবে। এতে গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং তারা দেশের উন্নয়নে আরও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান পিংক বাস সার্ভিসকে নারীর ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, নারী চালক, কন্ডাক্টর ও সহকারীদের অংশগ্রহণ নারীদের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
ঢাকায় যেসব রুটে চলবে পিংক বাস
রাজধানীতে প্রাথমিকভাবে ৯টি রুটে পিংক বাস চলাচল করবে।
১. নতুন বাজার (কোকাকোলা)-মতিঝিল
কোকাকোলা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল।
২. তালতলা-মতিঝিল
তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধমন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর ও সচিবালয় হয়ে মতিঝিল।
৩. ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার-জিপিও
ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশের পুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড়, গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয় ও মৎস্য ভবন হয়ে জিপিও।
৪. মিরপুর-১০-মতিঝিল
মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ ও পল্টন হয়ে মতিঝিল।
৫. মিরপুর-মতিঝিল
মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল।
৬. মিরপুর-১২-মতিঝিল
মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল।
৭. মোহাম্মদপুর-মতিঝিল
মোহাম্মদপুর, শংকর, ধানমণ্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউ মার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ ও পল্টন হয়ে মতিঝিল।
৮. আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল
আব্দুল্লাহপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুড়িল, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব ও গুলিস্তান হয়ে মতিঝিল।
৯. গাজীপুর-বিমানবন্দর
গাজীপুর, শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আব্দুল্লাহপুর ও আশপুর হয়ে বিমানবন্দর।
ঢাকার বাইরেও চলবে পিংক বাস
রাজধানীর বাইরে বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি রুটে দুটি এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে দুটি পিংক বাস চলাচল করবে।
চট্টগ্রামের বাসগুলো কালুরঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড় ও লালখান বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হয়ে পতেঙ্গা পর্যন্ত চলাচল করবে।































